নাটোরের সিংড়া উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন পাটচাষিদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। ডোবা-নালায় পাট জাগ দেওয়া, নদী ও বিলের ঘাটে পাট ধোয়া এবং উঠোনজুড়ে রোদে সোনালি আঁশ শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। পাটের বাম্পার ফলন ও তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় অধিকাংশ কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
চলতি মৌসুমে উপজেলার চামারী ও লালোর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে নতুন পাট। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত আঁশ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার লালোর গ্রামের পাটচাষি নুরুজ্জামান বলেন, “গত বছরের চেয়ে এবার ফলন অনেক ভালো পাইছি। দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে বিঘায় প্রায় ৯ মণ কইরা পাইছি। সার, সেচ আর শ্রমিক সব মিলিয়ে খরচ হইছে ২৭ হাজার টাকার মতো। আর দুই বিঘা থেকে পাওয়া ১৮ মণ পাট বেচে দাম আসবে প্রায় ৬৩ থেকে ৭২ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়েও ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকবে।”
তিনি আশা করছেন, গত কয়েক বছরের লোকসান এবার পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সিংড়ার সর্ববৃহৎ পাটের বাজার হাদিয়ান্দ হাটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার পাটের কালার ও মান খুব চমৎকার। ভালো জাত ও আঁশের উজ্জ্বলতাভেদে আমরা বর্তমানে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় প্রতি মণ পাট কিনছি। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবার আমরা কৃষকদের ভালো দাম দিতে পারছি।”
তবে পাটের ভালো ফলন ও দামে স্বস্তির পাশাপাশি কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নিচু এলাকার কৃষকরা। আগাম বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এসব এলাকায় পাট কাটতে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে গেছে।
লালোর ইউনিয়নের মাজগাতী গ্রামের কৃষক অনিল চন্দ্র বলেন, “দেড় বিঘা জমির পাট পানির নিচে ডুবে গেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাট কাটার জন্যই শ্রমিকদের দিতে হচ্ছে ৭০০ টাকা হাজিরা। আঁশ ছাড়ানো আর ধোয়ার খরচও দ্বিগুণ। সব মিলিয়ে এবার হয়তো দুই-তিন হাজার টাকা লোকসান হবে আমার।”
এদিকে পাটের ভরা মৌসুমে গ্রামীণ নারীদের জন্যও তৈরি হয়েছে বাড়তি কাজের সুযোগ। পাটখড়ির বিনিময়ে গৃহস্থের বাড়িতে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করছেন স্থানীয় অনেক নারী। তাদেরই একজন আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, এক মাস কাজ করে যে পরিমাণ পাটখড়ি পাওয়া যাবে, তা দিয়ে অন্তত ছয় মাসের রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাড়তি পাটখড়ি বিক্রি করে কিছু অর্থও আয় করা সম্ভব।
কৃষকদের সার্বিক সহায়তায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ খন্দকার ফরিদ বলেন, “চলতি মৌসুমে সিংড়ায় ১ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ও মান দুই-ই চমৎকার। পর্যাপ্ত পানি থাকায় এবার পাট ‘জাগ’ দিতে কৃষকদের কোনো বেগ পেতে হয়নি। নিচু জমির সামান্য কিছু ক্ষতি হলেও বেশিরভাগ কৃষকই এবার লাভবান হচ্ছেন। আমরা সার্বিক পরামর্শ ও কৃষি প্রণোদনা নিয়ে কৃষকের পাশে আছি।”
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, পাটের এই ভালো দাম আগামী মৌসুমেও বজায় থাকবে।
সিংড়ায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন, ভালো বাজারদর এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে পাটচাষ কৃষকদের জন্য আরও লাভজনক হয়ে উঠবে।