নিজস্ব প্রতিবেদক, সেনবাগ (নোয়াখালী)
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক কল্যান্দী জমিদারবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে ‘রায় চৌধুরী জমিদারবাড়ি’ নামে পরিচিত শতবর্ষী এই স্থাপনাটি বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাকে সংরক্ষণ ও সংস্কার করে জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন জমিদার বংশের বর্তমান উত্তরসূরি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্র ও ইতিহাস–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উনিশ শতকের শুরুর দিকে জমিদার রামেন্দ্র রায় চৌধুরী ও তাঁর ভাই কাঙালি রায় চৌধুরী যৌথভাবে এ জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা শুধু জমিদারি পরিচালনাই করেননি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে নানা জনহিতকর উদ্যোগ গ্রহণ করে এলাকায় বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।
শিক্ষা বিস্তারে তাঁদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মোহাম্মদপুর রামেন্দ্র মডেল হাই স্কুল’। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য গড়ে তোলা হয় ‘হরিহর চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি’। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় হরি মন্দির, দোল মন্দির, তুলসী মন্দির, মিলন মন্দির এবং কল্যান্দী সর্বজনীন পূজা মন্দির।
এ ছাড়া এলাকার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে শাহাজীর হাট, কল্যান্দী বাজার, বৈরাগির হাট ও ছমির মুন্সির হাট প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই জমিদার পরিবারের। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব বাজার আজও অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
জানা যায়, দূরদর্শী জমিদার রামেন্দ্র রায় চৌধুরী তাঁর নামানুসারে নোয়াখালীতে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। একসময় তাঁদের জমিদারির আওতায় ১৯টি তালুক ছিল, যার বিস্তৃতি ছিল বৃহৎ এলাকায়।
দেশে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর এই পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ভারতে চলে যান। তবে পরিবারের কয়েকজন উত্তরসূরি এখনো ঐতিহাসিক এই বাড়িতেই বসবাস করছেন এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জমিদার বংশের বর্তমান উত্তরসূরিরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির মূল কাঠামো আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় কল্যান্দী জমিদারবাড়িকে সংরক্ষণ করা গেলে এটি নোয়াখালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে যেমন এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় সচেতন মহল প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের আশা, যথাযথ সংস্কার ও পরিচর্যার মাধ্যমে কল্যান্দী জমিদারবাড়ি আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফিরে পাবে।