মোহাম্মদ উল্লাহ, বিশেষ প্রতিনিধি
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার এক ব্যক্তির অভিযোগ, তাঁর মায়ের বৈধ উত্তরাধিকারীর পরিচয় মুছে দিয়ে নানার সম্পত্তির ওয়ারিশ সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় পর পারিবারিক তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি বিস্ময়, ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, সম্পত্তির লোভে আপন ভাইয়েরা তাঁদের বড় বোনকে উত্তরাধিকার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।
অভিযোগকারী গাজী নুরুল হক শাহ সেনবাগ উপজেলার কানুচর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জানান, তাঁর পিতা খোন্দকার সিরাজুল হক এবং মাতা বিবি ফাতিমা। তাঁর নানা মোহাম্মদ ছেরাগ আলীর বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার অষ্টগ্রাম কাকিরপাড়া গ্রামে।
‘আমার মা ছিলেন সবার বড়’
গাজী নুরুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি জানতেন, তাঁর নানা ছেরাগ আলীর তিন মেয়ে ও চার ছেলে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তাঁর মা বিবি ফাতিমা ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মনোয়ারা বেগম, ছেমনা বেগম, গোলাপ মিয়া, জয়নাল মিয়া, জলিল মিয়া ও অলি মিয়া।
তিনি বলেন,
“শৈশব থেকে আমি নানাবাড়িতে যাতায়াত করেছি। আমি জানতাম আমার মা ছিলেন নানার বড় মেয়ে। কিন্তু অনেক বছর পর বাড়িতে ফিরে যখন আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নিতে শুরু করি, তখন জানতে পারি সরকারি নথিপত্রে নাকি আমার নানার মাত্র দুই মেয়ে ও চার ছেলে দেখানো হয়েছে। সেখানে আমার মায়ের নাম নেই। বিষয়টি শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই।”
৩৫ বছর পর উঠে এলো প্রশ্ন
গাজী নুরুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় তিনি নিজ এলাকা থেকে দূরে ছিলেন। প্রায় ৩৫ বছর পর পারিবারিক ইতিহাস ও আত্মীয়দের সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, উত্তরাধিকার সনদে তাঁর মায়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তাঁর প্রশ্ন, যদি তাঁর মা প্রকৃতপক্ষে মৃত ব্যক্তির বৈধ কন্যা হয়ে থাকেন, তাহলে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাঁকে উত্তরাধিকার সনদ থেকে বাদ দেওয়া হলো?
তিনি বলেন,
“আমরা গরিব বলে কি আমাদের অধিকার থাকবে না? আমার মা যদি ছেরাগ আলীর মেয়ে হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম কেন থাকবে না? আর যদি না থাকেন, তাহলে এত বছর আমরা যাকে নানা বলে জেনে এসেছি, সেই সম্পর্কের ব্যাখ্যা কী?”
সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে সন্দেহ
অভিযোগকারী মনে করেন, উত্তরাধিকার সনদ থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে সম্পত্তি বণ্টনের বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
তাঁর ভাষায়,
“আমার মা জীবিত থাকুক বা না থাকুক, তাঁর সন্তানদের আইনগত অধিকার রয়েছে। কিন্তু নামই যদি না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আমাদের অস্তিত্ব স্বীকার করবে না। এ কারণেই বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
তিনি দাবি করেন, বিষয়টির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন থাকতে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশ্ন
গাজী নুরুল হক তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় বিষয়ও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে নারী উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তির অংশ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন,
“যাঁরা নিজেদের নামের আগে আলহাজ্ব লিখছেন, তাঁরা কীভাবে একজন বোনের অধিকার অস্বীকার করেন? দুনিয়ার আদালতকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও সৃষ্টিকর্তার বিচারে কী জবাব দেবেন?”
তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, যদি সত্যিই কোনো বৈধ উত্তরাধিকারীর নাম সরকারি নথি থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
তাঁদের মতে, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় বিষয়টি আদালত বা প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।
একজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,
“সম্পত্তির জন্য ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে সরকারি নথিতে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সেটি অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
আইনে কী বলে?
আইনজীবীদের মতে, কোনো মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার সনদ তৈরির সময় তাঁর সব বৈধ উত্তরাধিকারীর নাম উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো উত্তরাধিকারীর নাম বাদ দেওয়া হলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর উত্তরসূরিরা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন অথবা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। প্রয়োজন হলে ওয়ারিশ সনদ সংশোধন কিংবা নতুন সনদ ইস্যুর আবেদন করা যায়।
অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ভাইদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের অবস্থান জানা যায়নি।
তবে সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে বক্তব্য দিতে চাইলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
তদন্তের দাবি
গাজী নুরুল হক বলেন, তিনি প্রথমে সামাজিকভাবে বিষয়টির সমাধান চান। তবে প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করবেন।
তিনি বলেন,
“আমি কাউকে অপমান করতে চাই না। শুধু জানতে চাই, আমার মায়ের নাম কেন বাদ দেওয়া হয়েছে। যদি ভুল হয়ে থাকে, সংশোধন করা হোক। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরকারি নথিপত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পারিবারিক রেকর্ড ও স্থানীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং সংশ্লিষ্ট সবার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।