একসময় কাজহীনতা আর অভাব-অনটনে দিন কাটত জয়ন্ত সেনের। নিয়মিত কোনো আয় ছিল না, পড়াশোনাও মাধ্যমিকের পর থেমে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিতে কেটে যাচ্ছিল সময়। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন কখনো হারিয়ে যায়নি। সুযোগ পেয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের জামুরীপাড়া এলাকার ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ।
জয়ন্ত সেন বিশ্বেসর সেনের ছেলে। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজো। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। এরপর কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলেও নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাননি।
একপর্যায়ে ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর রেইজ প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের একটি লিফলেটের মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন জয়ন্ত। পরে তিনি ইএসডিও কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করেন।
নির্বাচিত হওয়ার পর ইএসডিওর রেইজ প্রকল্পের সহযোগিতায় মাস্টার ক্রাফটপার্সন মো. সাদেকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। প্রশিক্ষণে ইলেকট্রনিক বিভিন্ন যন্ত্রের ত্রুটি শনাক্তকরণ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিংয়ের কৌশল শেখেন।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জয়ন্তের আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন চাকরি বা অন্যের কাজের অপেক্ষায় না থেকে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করবেন।
প্রশিক্ষণ শেষে ইএসডিওর রেইজ প্রকল্প থেকে পাওয়া ২১ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তির অর্থ তার উদ্যোগের প্রথম পুঁজি হয়ে ওঠে। ওই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় একটি মেশিন কেনেন তিনি। এরপর ঠাকুরগাঁও শহরের বদিউলের মোড়ের ঘোষপাড়া এলাকায় ছোট পরিসরে শুরু করেন ‘এ আর কে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার’।
শুরুর দিকে দোকানে গ্রাহক কম থাকলেও হতাশ হননি জয়ন্ত। কাজের প্রতি আন্তরিকতা, প্রশিক্ষণে অর্জিত দক্ষতা এবং ভালো সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেন। একজন গ্রাহকের মাধ্যমে আরেকজনের কাছে তার কাজের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে নিজের ইলেকট্রনিক্স সার্ভিসিং ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন জয়ন্ত সেন। নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনেও সহায়তা করছেন তিনি। ভবিষ্যতে দোকানটি আরও বড় করে কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
জয়ন্ত সেন বলেন, “একসময় আমার কোনো কাজ ছিল না। কী করব, কীভাবে নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু করব—এসব নিয়ে সব সময় চিন্তা হতো। একদিন ইএসডিওর কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা জানতে পারি। তখন মনে হলো, সুযোগটা কাজে লাগানো উচিত।”
তিনি বলেন, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে মানুষ তার কাজ সম্পর্কে জানতে শুরু করে এবং পরিচিতি বাড়তে থাকে। এখন তিনি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন।
জয়ন্ত আরও বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা, এখন আর নিজেকে বেকার মনে হয় না। নিজের একটা পরিচয় তৈরি হয়েছে। নিজের হাতে কাজ আছে, আয় আছে—এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। ভবিষ্যতে যেন আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি, সেই স্বপ্নও আছে।”
ইএসডিওর ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট অফিসার মো. সাজেদুর রহমান বলেন, জয়ন্তের মতো অনেক তরুণের মধ্যেই কাজ করার আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাব, সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে অনেকেই তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেন না।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন তরুণকে বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা এবং তার জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।”
সাজেদুর রহমান আরও বলেন, জয়ন্ত প্রশিক্ষণের সুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পর সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন। ইএসডিওর সহায়তার সঙ্গে নিজের পরিশ্রম ও উদ্যোগ যুক্ত করেই তিনি একটি টেকসই আয়ের পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
জয়ন্তের এই সাফল্য দেখাচ্ছে, সঠিক প্রশিক্ষণ, সামান্য পুঁজি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেলে বেকার তরুণরাও নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। অভাবকে বাধা না বানিয়ে দক্ষতাকে পুঁজি করে এগিয়ে যাওয়ার এমন উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার হতে পারে।