নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে!! রাজা শশাঙ্ক ( ৫৯০-৬৩৭ খ্রি.): বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা। তিনি গৌড় ও বঙ্গ অঞ্চলকে একত্রিত করে রাজধানী কর্ণসুবর্ণে স্থাপন করেন। পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল (প্রথম গোপাল) ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং গোপাল বাংলার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রথম বাঙালি রাজা ছিলেন। সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন ১০৯৬ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ১২০৪ সালে রাজা লক্ষন সেনকে দুপুর বেলা পরাজিত করে বাংলাকে স্বাধীন করেন। ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রি.): দিল্লির সুলতানি শাসন থেকে বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে স্বাধীন সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৫২-১৩৫৮ খ্রি.): সোনারগাঁও কে রাজধানী ঘোষণা করে “শাহ-ই-বাঙ্গালাহ” উপাধি ধারণ করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজা গণেশ (১৪১৪-১৪১৮ খ্রি.): ইলিয়াস শাহী বংশের পর বাংলার স্বাধীন শাসক ছিলেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.): হোসেন শাহি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা, যা বাংলার স্বাধীন শাসক ছিলেন। মুর্শিদ কুলি খান (১৭১৭-১৭২৭ খ্রি.): স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদকে রাজধানী করে শাসন করেন। নবাব আলীবর্দী খাঁ ১৭৪০ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন শাসক ছিলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৩৩–১৭৫৭) ছিলেন বাংলা, বিহার ও ওডিশার শেষ স্বাধীন শাসক ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক শাসক স্বাধীনতার ঘোষণা করে ছিলেন।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে নবাবের পরাজয় ঘটে। নবাবের সেনাপতি মীর জাফরের চরম বিশ্বাস ঘাতকতা, নবাব বাহিনীর পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল। নবাবের পক্ষে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ সৈন্য এবং রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ও তাদের মিত্র বাহিনীর পক্ষে ছিল মাত্র ৩,০০০ সৈন্য ছিল। মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ প্রমুখের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এই পরাজয়ের ফলে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয় এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের শাসন ও সাম্রাজ্য বিস্তারের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে এদেশের সাধারণ কৃষক, সাধু-সন্ন্যাসী, আদিবাসী এবং কোম্পানির দেশীয় সৈনিকরা বিদ্রোহ করেছিলেন। হাজী শরিয়ত উল্যাহ এবং দুদুমিয়ার ফরায়েজি আআন্দোলন। মজনু শাহ ও ভবানী পাঠকের নেতৃত্বাধীন ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০)।
সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭): ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত এই বিদ্রোহে ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডে নেতৃত্ব দেন। সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫): সাঁওতাল নেতা সিধু ও কান্নু এবং নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-১৮৬০) সাধারণ কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই বিদ্রোহ করেন। ১৮৩১ সালে তিতুমীরের আন্দোলন, নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে বাঁশের কেল্লা বানিয়ে মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং নিহত হয়েছেন। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সেনারা লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে হত্যা করেছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯) প্রায় ১০০০ ভারতীয়কে হত্যা করেছে। ওদেরকে বাংলাদেশের কেউই স্মরণ করেনা। ব্রিটিশদের কেউই হত্যাকারী হিসেবে রাজাকার ও আলবদর বলে না।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও দেশভাগের সময় সংঘটিত দাঙ্গা ও সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ২০ লক্ষ, যাদের অধিকাংশ মুসলিম। প্রাণ বাঁচাতে ও নিরাপত্তার খোঁজে প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ ধর্মীয় ভিত্তিতে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমান। এই বিশাল শরণার্থী স্থানান্তরের পথে চরম খাদ্যসংকট, রোগবালাহী ও চরম আবহাওয়ার কারণেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়। ওদেরকে বাংলাদেশের কেউই স্মরণ করেনা। ব্রিটিশদের কেউই হত্যাকারী হিসেবে রাজাকার ও আলবদর বলে না।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কতজন নিহত হয়েছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, গবেষণা এবং পত্রপত্রিকা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও পরবর্তীতে মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮ থেকে ১০ জনেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়, যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূলত ৫ জন ভাষা শহীদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন (বাংলাদেশ সরকারের গ্যাজেট)। তবে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের কোনো তালিকাভুক্ত রেকর্ড জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নেই। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৫০৬ জন (সুত্র; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়)। একজন সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রশ্ন থেকে যায় আসলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে সঠিক সংখ্যা নিয়ে কোন সরকারী দলের অথবা দেশি-বিদেশি ইতিহাসবিদরা গবেষণা করে নাই। কিন্তু রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা জিকির তুলে ভোটের মাঠ গরম করে রাখা হয়েছে।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনের সাথে দেশের জনগণ সম্পৃক্ত হলে তা গণ আন্দোলন থেকে গণ অভ্যুত্থানে রুপ নেয় । সেই গণ অভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদ ৪ঠা ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন । দীর্ঘ ৯ বৎসর পরিচালিত আন্দোলন ১৯৯০ এ এসে গণ আন্দোলনের রুপ নেয়। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ১০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্রগ্রামের লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভার পূর্বে পুলিশ নির্বিচার গুলিবর্ষণ করলে ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এ হত্যার জন্য জেনারেল এরশাদের কোন বিচার হয় নাই।
২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর ঢাকার পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর ডাকা সমাবেশ থেকে লগি-বৈঠা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ওপর পল্টনে বর্বরোচিত হামলা ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা লগি-বৈঠার হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। এই রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ঢাকায় ১৩ জন নিহত এবং সারাদেশে শতাধিক নিহত সহস্রাধিক আহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের নায়কদের বিচার দাবি করা হয়নি।
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’-এর মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড হয়। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারি তথ্যে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে মোট ৫৮ জন নিহতের তথ্য ও পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৩২ জন হত্যার প্রমাণ মিলেছে। হেফাজতে ইসলামের পরিচালিত ৪০,০০০ কওমী মাদ্রাসা থাকার পরও নিহতের সংখ্যার তালিকা তৈরি করা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে বিচার দাবি করা হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে কোটা সংস্কার ও সরকার পতনের আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নৃশংস দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডকে জুলাই হত্যাকাণ্ড বা জুলাই গণহত্যা বলা হয়। এই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ জনেরও বেশি মানুষ শহীদ হন এবং ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা মোট ১০ কোটি ১০ লাখ (১০১ মিলিয়ন) ডলার চুরি করেছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা)। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং খাতের অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। সাইপ্রাসে এস আলমের ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা আটক।। এরপরও লুটপাটকারী ও দেশাদ্রোহীদের দাবি এস আলম কে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এস আলম কে আবারও ইসলামী ব্যাংক লুটের সুযোগ দিতে চায় তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একটি স্বাধীন দেশে দুনীতি, লুটপাট, টাকা পাচার, মানবপাচার, নারী ও শিশু ধর্ষণ অব্যাহত আছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদদে লুটপাট ঘটেছে। ২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকার পরও দ্রুত ধর্ষকের বিচার শেষ হচ্ছে না। লুটপাটকারী বিচার করা হলে, জুলাই বিপ্লবের অংশীদার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাতি ইতিহাসের পাতায় স্থান দিবে।
ড. খন্দকার নাজমুল হক
প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।