ফেনীতে অজ্ঞাতপরিচয় বা বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ময়নাতদন্ত শেষে এসব মরদেহ বহনে অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ির পরিবর্তে পৌরসভার ময়লাবাহী গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দাফনের আগে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল ও জানাজার ব্যবস্থা না করার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলো দাফনের জন্য শহরের সুলতানপুরে অবস্থিত ফেনী পৌর কবরস্থানে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, উপযুক্ত যানবাহনের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এসব মরদেহ পৌরসভার ময়লাবাহী ট্রাকে করে কবরস্থানে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পরও সব মরদেহের গোসল ও জানাজার নামাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে কবরস্থান ঘুরে দেখা যায়, মরদেহ গোসলের জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। পানি তোলার মোটর না থাকায় পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হয়। গ্রীষ্মকালে পুকুর শুকিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
এছাড়া কবরস্থানটির সীমানাপ্রাচীর ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। ফলে দিনের বেলায় গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ এবং সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ সুযোগে কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় মাদকসেবন ও জুয়ার আসরও বসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে ফেনী পৌর কবরস্থানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথে দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে ফেনীতে নিহত অজ্ঞাতপরিচয় বা বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের অন্যতম প্রধান স্থান এটি। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে এখানে দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ‘বেওয়ারিশ’ পরিচয় থাকলেও প্রতিটি মরদেহই কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান, বাবা, ভাই কিংবা স্বজন। তাই মৃত্যুর পর তাদের মর্যাদাপূর্ণভাবে পরিবহন ও দাফন নিশ্চিত করা মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, পৌরসভার একার পক্ষে সম্ভব না হলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, অজ্ঞাত মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত ও স্থায়ী ব্যবস্থা করা জরুরি।
আরেক বাসিন্দা আজগর হোসেন অভিযোগ করেন, সন্ধ্যার পর কবরস্থান এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। পাশের পরিত্যক্ত সার কারখানা এলাকাতেও মাদকসেবনের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত সামর্থ্য ও বাজেটের মধ্যেই তারা কবরস্থানটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কবরস্থানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অজ্ঞাত মরদেহ পরিবহনের জন্য পৃথক যানবাহনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ কাজের দায়িত্বে থাকা পৌরসভার আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কৃষ্ণপদ সাহা বলেন, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পরিবহনের জন্য পৌরসভার আলাদা কোনো যানবাহন নেই। ফলে বর্তমানে যে যানবাহন রয়েছে, সেটি দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীর ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি মরদেহ পরিবহনের জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার) ও ফেনী পৌর প্রশাসক মো. দিদারুল আলম বলেন, মুসলিম রীতি অনুযায়ী গোসল ও জানাজা ছাড়া মরদেহ দাফনের বিষয়টি তাকে ব্যথিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ময়লাবাহী গাড়ির পরিবর্তে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ির ব্যবস্থা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।