• রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন
Headline
ইনার সার্কুলার রিং রোডে দৃশ্যমান অগ্রগতি চান প্রধানমন্ত্রী সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পাঁচবিবি মোহাম্মদপুরে বৃক্ষরোপণ ঘুরতে এসে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, গাছে ধাক্কা প্রাইভেটকারের নবীনগরে মারধরের পর অচেতন ব্যক্তি উদ্ধার, অবস্থা সংকটাপন্ন গোয়ালঘরের দেয়াল কেটে বিদেশি দুই গরু চুরি গঙ্গাচড়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক কে হত্যার চেষ্টা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিতে আসাদ সবুজের পাশে সাংবাদিকরা ন্যায্য অধিকার ও বৈষম্যহীন মর্যাদার দাবিতে মানিকগঞ্জে মাদ্রাসা শিক্ষকরা পটুয়াখালীতে ১২ বছরের শিশুকে অপহরণ, ৮ ঘণ্টায় উদ্ধার অপারেশনের জন্য ছুটতে হচ্ছে জেলা সদরে, ভোগান্তিতে লক্ষ্মীপুরের রোগীরা

মানুষের স্বাক্ষর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর—ঠাকুরগাঁওয়ের দীর্ঘ সংগ্রাম

রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি / ২৭ Time View
Update : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। সেই দাবি আদায়ে বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন, মানববন্ধন, শোভাযাত্রা, সভা-সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান এবং গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।

দীর্ঘ আন্দোলন ও অপেক্ষার পর অবশেষে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃশ্যমান যাত্রা শুরু হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে একটি জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আন্দোলন ও নিরলস প্রচেষ্টার ইতিহাস।

ঠাকুরগাঁওয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক পুরোনো হলেও ২০১৩ সালে তা সুসংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়। ‘ঠাকুরগাঁও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে শুরু হয় ধারাবাহিক কর্মসূচি।

মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা এই জেলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ধীরে ধীরে এই দাবি জেলার মানুষের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি ছিল গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। আন্দোলনকারীরা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন।

শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাক্ষর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে একটি জেলার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার রূপ দেয়।

স্মারকলিপি দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে। পাশাপাশি চলতে থাকে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, শোভাযাত্রা ও জনসম্পৃক্ত নানা কর্মসূচি। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আন্দোলন একসময় সরকারের দৃষ্টিও আকর্ষণ করে।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়। তবে ঘোষণার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ২০২২ সালে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়।

পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১২ জুন মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।

এরপর জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদে ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২৩’ পাস হয়। পরে ১৩ নভেম্বর গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ২০২৬ সালের ৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইস্রাফীলকে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

প্রথম উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কার্যক্রম আরও এগিয়ে যায়। সদর উপজেলার মহেশালী এলাকায় প্রায় ৮৬ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ঠাকুরগাঁওবাসীর অপেক্ষা ছিল আরও একটি দৃশ্যমান অধ্যায়ের।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে একসময় ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, যে দাবির পক্ষে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল, একের পর এক স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল—সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দৃশ্য এবার প্রত্যক্ষ করলেন জেলার মানুষ।

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ইতিহাসে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বেদনার গল্পও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে যারা রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন, সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই।

তারা হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের মুহূর্ত দেখে যেতে পারেননি অনেক আন্দোলনকারী।

আবার আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত আন্দোলনের সেই দিনগুলো—মানববন্ধন, মিছিল, সভা-সমাবেশ আর মানুষের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের দৃশ্য।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন ঠাকুরগাঁওয়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে জড়ো হন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন।

তবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার বড় কর্মযজ্ঞ। স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা কার্যক্রম চালু, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি, গবেষণা এবং আধুনিক উচ্চশিক্ষার পরিবেশ তৈরি—এসব কাজ এখন সামনে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি এবং পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণাধীন পর্যায়ে রয়েছে। তবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁওবাসীর বহু বছরের স্বপ্ন আর শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। সদর উপজেলার মহেশালীর প্রায় ৮৬ একর জমিতে সেই স্বপ্নের একটি দৃশ্যমান ঠিকানা তৈরি হয়েছে।

প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের গণস্বাক্ষর থেকে শুরু করে রাজপথের আন্দোলন, সরকারের ঘোষণা, আইন পাস এবং শেষ পর্যন্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন—ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি একটি জেলার মানুষের সম্মিলিত স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা