এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব
প্রতিষ্ঠাতা, মাওলানা আব্দুল হাকিম রহ: ফাউন্ডেশন
ধর্ম ও উপজাতি বিষয়ক যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ কংগ্রেস
খতিব ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক
পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, তাকওয়া, আনুগত্য, মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগের এক মহান ইবাদত। বর্তমান সময়ে কুরবানীকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি কিছু অসচেতনতা, অপচয়, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক বৈষম্যের চিত্রও দেখা যায়। তাই ইসলামী বিধান, বাস্তবতা, মাসআলা, পরিচ্ছন্নতা ও মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
“কুরবানী” শব্দটি আরবি “কুরব” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় নির্ধারিত সময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পশু জবাই করাকে কুরবানী বলা হয়। পবিত্র আল-কুরআন-এ মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
> “অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর।”
— সূরা আল-কাউসার: ২
কুরবানীর ইতিহাস মুসলিম জাতির জন্য এক অনন্য ত্যাগের শিক্ষা। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর আদেশ পালনে পিতা-পুত্র উভয়ের নিঃশর্ত আনুগত্য মানবজাতির জন্য চিরন্তন আদর্শ হয়ে আছে। পরে আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানীর ব্যবস্থা করেন। সেই স্মৃতিই আজও মুসলিম উম্মাহ কুরবানীর মাধ্যমে ধারণ করে আসছে।
পবিত্র আল-কুরআন-এ আরও বলা হয়েছে—
> “আল্লাহর নিকট পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
— সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, কুরবানীর মূল বিষয় পশুর আকার বা বাহ্যিক জাঁকজমক নয়; বরং আন্তরিকতা, তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকিম এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের উপর কুরবানী ওয়াজিব। গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েজ। তবে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পশুর নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হতে হবে এবং পশু ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। অন্ধ, অতিরিক্ত রোগাক্রান্ত, খোঁড়া বা দুর্বল পশু কুরবানী করা বৈধ নয়।
কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার মধ্যে অন্যতম হলো সঠিক সময়ে কুরবানী করা। ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। ঈদের নামাজের আগে জবাই করলে তা কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে না। গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারে। তবে প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
বর্তমান সমাজে কুরবানীকে ঘিরে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় পশুর ছবি প্রচার, লোক দেখানো আয়োজন কিংবা অতিরিক্ত ব্যয় ইসলামের সরলতা ও তাকওয়ার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণ।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
> “তোমরা যখন জবাই করবে, উত্তমভাবে জবাই করো।”
— সহীহ মুসলিম
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পশুর প্রতিও ইসলামের মানবিক আচরণের নির্দেশনা রয়েছে। পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া, ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা কিংবা অপরিষ্কার স্থানে জবাই করা ইসলাম সমর্থন করে না।
বর্তমান নগরজীবনে কুরবানীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কুরবানীর পর রাস্তাঘাট, ড্রেন ও খোলা স্থানে পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটে। এটি জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় হুমকি। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই কুরবানীর পর দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা ধর্মীয় ও নাগরিক দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কুরবানীর পশুর বর্জ্য মাটিচাপা দেওয়া, ড্রেনে না ফেলা এবং দ্রুত অপসারণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
কুরবানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সমাজের অসহায় ও হকদার মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের সমাজে এমন বহু পরিবার রয়েছে, যারা প্রকৃতপক্ষে কুরবানীর গোশত পাওয়ার অধিকারী, কিন্তু আত্মসম্মানের কারণে কারো কাছে হাত পাতেন না কিংবা নিজেদের অভাব প্রকাশ করেন না। অনেকেই আছেন, যারা সামর্থ্য না থাকার কারণে কুরবানী দিতে পারেন না, কিন্তু সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। ইসলামের শিক্ষা হলো—এমন মানুষদের খুঁজে বের করে সম্মানের সঙ্গে সহযোগিতা করা।
পবিত্র আল-কুরআন-এ মহান আল্লাহ বলেন—
> “তোমরা যা কিছু ভালো ব্যয় কর, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের জন্য ব্যয় করো।”
— সূরা আল-বাকারা: ২১৫
কুরবানীর গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-মিসকিনদের অগ্রাধিকার দেওয়া ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। কারণ কুরবানীর প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের অবহেলিত ও নীরব কষ্টে থাকা মানুষগুলোর ঘরেও আনন্দ পৌঁছে যায়।
বর্তমানে অনলাইন কুরবানীর প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সময়োপযোগী হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিশ্বস্ত কি না এবং শরীয়তসম্মতভাবে কুরবানী সম্পন্ন হচ্ছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ ইসলামে ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ত ও পদ্ধতি উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
কুরবানী মানুষকে ত্যাগ, সংযম, সহমর্মিতা, তাকওয়া ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে যদি কুরবানীর এই শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়, তবে বৈষম্য, অহংকার ও স্বার্থপরতা অনেকাংশে দূর হতে পারে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন ও পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আসুন, আমরা কুরবানীকে শুধু উৎসব হিসেবে নয়; বরং তাকওয়া, মানবতা, পরিবেশ সচেতনতা ও আত্মশুদ্ধির মহান প্রশিক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শুদ্ধ নিয়তে, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও মানবিকভাবে কুরবানী আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।