যবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ আল আমিন
বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্টদের মতো স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীদের স্বীকৃতি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জারি করা গেজেট ও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, ফিজিওথেরাপিস্টসহ রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল (বিআরসি)–এর অধীনেই পরিচালিত হবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধিতা, সড়ক দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, পক্ষাঘাত, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগীর চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্টসহ বিভিন্ন রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ২০১৮ সালে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন প্রণয়ন করে। আইনের আওতায় রিহ্যাবিলিটেশন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠক্রম, পেশাজীবীদের নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিআরসির ওপর অর্পণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিধিমালার মাধ্যমে কাউন্সিলের কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করা হয়।
এদিকে সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জারি হওয়া নতুন প্রজ্ঞাপনে রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীদের নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও স্বীকৃত ডিগ্রি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ফিজিওথেরাপিস্টসহ মোট ১২টি পদের যোগ্যতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এখন থেকে নির্ধারিত ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ রিহ্যাবিলিটেশন প্র্যাকটিশনার হিসেবে চাকরি বা পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ফিজিওথেরাপি পেশায়। আগে বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রিধারীরা ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে চাকরিতে আবেদন করতে পারলেও নতুন গেজেট অনুযায়ী এখন থেকে কেবল ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি, ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, ব্যাচেলর অব সায়েন্স (সম্মান) ইন ফিজিওথেরাপি অথবা ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিওথেরাপি ডিগ্রিধারীরাই ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। পাশাপাশি এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপও বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়–এর ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন (বিপিটিআর) ডিগ্রিকেও বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইনের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে যবিপ্রবির বিপিটিআর ডিগ্রিধারীরা এখন সরকার স্বীকৃত রিহ্যাবিলিটেশন প্র্যাকটিশনার হিসেবে পেশাগত স্বীকৃতি ও নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি যবিপ্রবির ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এবং পেশাগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক মাইলফলক।
সরকারি এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি শিক্ষার মান, পেশাগত পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ডিগ্রির নাম ও পেশাগত স্বীকৃতি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, নতুন প্রজ্ঞাপন তা অনেকাংশে দূর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টদের ক্ষেত্রেও স্বীকৃত ডিগ্রি নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এছাড়া সাইকোলজিস্ট, পুষ্টিবিদ, স্পেশাল এডুকেটর ও ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (যুগ্মসচিব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। কাউন্সিলের মাধ্যমে রিহ্যাবিলিটেশন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রিহ্যাবিলিটেশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই গেজেট ও প্রজ্ঞাপন দেশের পুনর্বাসনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও পেশাভিত্তিক, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য সুনির্দিষ্ট ডিগ্রি নির্ধারণ এবং বিআরসির নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আরও সুস্পষ্ট হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও পেশাটি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।