নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে চামড়া শিল্প ধ্বংসের প্রধান কারণ হলো সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারিগুলোতে পরিবেশবান্ধব ইটিপি ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি সচল না থাকা, যার ফলে বৈশ্বিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সনদ না পাওয়া। এছাড়া, অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, কাঁচা চামড়ার সিন্ডিকেট, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তির অভাব এই খাতের ধসের পেছনে দায়ী। দেশীয় চামড়াশিল্পের বিকাশ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের চামড়াশিল্পের কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত ও উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) এক গবেষণা অনুসারে, এ জন্য যেসব কারণ দায়ী, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) সক্ষমতার অভাব, কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে ট্যানারিমালিকদের যথাযথ ধারণা না থাকা, কঠিন বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা ও ট্যানারির অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মান উন্নত না হওয়া। এসব কারণে চামড়াশিল্পের মানসনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। যার ফলে দেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়া ইউরোপের বদলে চীনের বাজারে কমদামে রপ্তানি করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের আসন্ন ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভিতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। ২০২৫ সালে গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ছিল। সেই হিসেবে এ বছর প্রতি বর্গফুটের দাম ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা মাত্র ৬; অথচ এ সংখ্যা ভারতে ১৩৯, চীনে ১০৩, ইতালিতে ৬৮, ব্রাজিলে ৬০, তাইওয়ানে ২৪, স্পেনে ১৭, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কে ১৬ ও ভিয়েতনামে রয়েছে ১৪টি। এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে চামড়ার বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। দেশীয় কাঁচা চামড়ার পর্যাপ্ত জোগান থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পকারখানাগুলোকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ফিনিশড চামড়া আমদানি করতে হয়, যা কারখানাগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যার জন্য ১ হাজার ৫৯৯ কোটি ডলারের তুলা, সুতা, কাপড়, সরঞ্জামসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করতে হয়েছে। অন্যদিকে দেশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকার পরও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি মাত্র ১২২ কোটি ডলার। এ সময় চামড়াজাত পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ছিল প্রায় ৪৬৮ বিলিয়ন বা ৪৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ চামড়ার বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা মাত্র দশমিক ২৬ শতাংশ (প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি ২০২৪)।
বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার কম বাজারমূল্যের প্রধান কারণ হলো ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস, এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে উচ্চ খরচ। চামড়া শিল্পনগরে কমপ্লায়েন্সের অভাব, লবণসহ আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি, এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অদক্ষতার কারণে প্রতি বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি হয়, যার ফলে প্রান্তিক বিক্রেতারা ন্যায্য মূল্য পান না। দীর্ঘদিন ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম থাকার পেছনে সাতটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা। কারণগুলো হচ্ছে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে সরবরাহ; লবণের মূল্যবৃদ্ধি, ভ্যানভাড়া ও ঈদ বোনাস; ক্রেতার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া ও বিপুল সংগ্রহ; ব্যবসায়ীদের তহবিল সংকট; ট্যানারিমালিকেরা সঠিকভাবে অর্থ দেন না; ট্যানারিমালিকদের সিন্ডিকেট এবং বাজার সিন্ডিকেট। কাঁচা চামড়ার সঠিক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতে সরকারিভাবে সিন্ডিকেট বন্ধ করার পাশাপাশি লবণের দাম হ্রাস, লেনদেন ব্যবস্থা তদারকি, ট্যানারিমালিকদের যথাসময়ে অর্থ দিতে বাধ্য করা, সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর করা এবং ট্যানারিগুলোর মানোন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ৬২ শতাংশ কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী মনে করেন, চামড়া খাতে সরকারের প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। প্রণোদনা থাকলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হতো।
সারা দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ২৩০টির বেশি ট্যানারি রয়েছে। এর মধ্যে আধুনিক ট্যানারির সংখ্যা মাত্র ৩০টির মতো। ৮৫ শতাংশ ট্যানারির অবস্থান ঢাকায়। অধিকাংশ বা ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ ট্যানারির বিনিয়োগ ২১ কোটি টাকার কম। এ ছাড়া ১৩ শতাংশ ট্যানারিতে ২১ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকা এবং ৩ শতাংশ ট্যানারিতে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেকই উদ্যোক্তাদের নিজস্ব বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্যানারিগুলো যেসব চামড়া রপ্তানি করছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্রাস্ট চামড়া, ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া ২৩ শতাংশ ফিনিশড চামড়া, ৩৪ শতাংশ ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়ার মিশ্রণ এবং ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ ওয়েট ব্লু চামড়া। তবে ৭২ শতাংশ ট্যানারির চামড়া বিশ্বের প্রসিদ্ধ কোনো ব্র্যান্ড নেয় না।
২০১৩ সালের দিকে গরুর কাঁচা চামড়ার বাজারমূল্য প্রতি বর্গফুট প্রায় ৮০–৯০ টাকার মধ্যে ছিল। অথচ ২০২০ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩৫–৪০ টাকায়। ২০২১ সালে সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে অনেক স্থানে সেই মূল্য নিশ্চিত হয়নি। ২০২৩ সালে ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ৫০–৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪৫–৪৮ টাকা। ২০২৪ সালে তা কিছুটা বাড়িয়ে ঢাকায় ৬০–৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫–৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একইসাথে প্রতি পিস গরুর চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য ঢাকায় ১,২০০ টাকা ও ঢাকার বাইরে ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫ সালে সরকার আবারো দাম বৃদ্ধি করে ঢাকায় ৬০–৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫–৬০ টাকা নির্ধারণ করে। প্রতি পিস গরুর চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয় ঢাকায় ১,৩৫০ টাকা এবং বাইরে ১,১৫০ টাকা। কাগজে -কলমে মূল্য বাড়লেও বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।। অনেক অঞ্চলে কোরবানির চামড়া মাত্র ৫০ টাকা, ১০০ টাকা, এমনকি বিনামূল্যেও ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন মানুষ। কোথাও কোথাও চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, পানিতে ভাসিয়ে দেয়া বা নষ্ট করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতি, রফতানি খাত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার দিনের পর দিন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
হাজার বছর ধরে এদেশের কওমী মাদ্রাসা এবং ইয়াতিম খানাগুলোর অর্থের উৎস বাৎসরিক কুরবানীর পশুর চামড়া থেকে আসে। প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদরাসায় লাখ লাখ এতিম, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে চামড়ার টাকায়। কওমী মাদ্রাসার অধিকাংশই সরকারি অনুদান ছাড়াই সাধারণ মানুষের দান, জাকাত, ফিতরা এবং কোরবানির চামড়ার অর্থে পরিচালিত হয়। অতীতে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে অনেক মাদরাসা তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ও শিক্ষাব্যয় পরিচালনা করতে সক্ষম হতো। কিন্তু বর্তমান চামড়ার বাজার পরিস্থিতিতে সেই আয় ভয়াবহভাবে কমে গেছে। অথচ একই চামড়া থেকে তৈরি জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, জ্যাকেট, গ্লাভসসহ নানা পণ্যের বাজারমূল্য ক্রমাগত বাড়ছেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কাঁচামালের দাম এত কমে যাচ্ছে কেন? এর পেছনে কি শক্তিশালী সরকারী বা রাজনৈতিক সিন্ডিকেট কাজ করছে? একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, আড়তদার এবং মধ্যস্বত্বভোগী পরিকল্পিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কাঁচা চামড়ার মূল্য কমিয়ে রাখছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কোরবানিদাতা মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং জাতীয় অর্থনীতি।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে, যা দেশের চামড়া খাতের মূল অংশ। কওমি মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহে বিশাল ভুমিকা পালন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো চামড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। যারা পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও দেশের অর্থনৈতিক খাত ধ্বংস করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একশ্রেণির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী বাংলাদেশের চামড়ার বাজারমূল্য কমিয়ে কাঁচা চামড়া প্রতিবেশী ভারতে পাচার করছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১০০ কেজি গোশত মাপের একটি গরুর চামড়া ১৩শ’ থেকে ১৪শ’ রুপি। এতে বাংলাদেশী টাকায় দাম পড়ে ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা। এর থেকে বড় মাপের ভালো চামড়া ১৬০০ থেকে ২০০০ রুপি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশী টাকায় আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার ২শ’ টাকা পর্যন্ত। একইসাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। চামড়া শিল্প রক্ষা হলে দেশের অর্থনীতি, রফতানি খাত, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কওমী মাদ্রাসা এবং অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা হবে। বাজারের জুতার দামের সাথে সমন্বয় করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করতে হবে। চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। একই সাথে ওয়াক্ফভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে চামড়ার অর্থ সঠিকভাবে সমাজের দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে। ভারতে কাঁচা চামড়ার মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন। বাংলাদেশ সরকারের উচিত পাকিস্থান, ভারত, তুরস্কের সাথে সমন্বয় করে কাঁচা চামড়ার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা। মওমী মাদ্রাসাগুলোর অর্থব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে কাঁচা চামড়ার দাম দ্বিগুন করতে হবে।
ড. খন্দকার নাজমুল হক
প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ