• রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন
Headline
পেট্রোলসদ্যৃশ তরল ঢেলে শ্রমিক সর্দারকে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা, রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি কালীগঞ্জে এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী গ্রেফতার সুসুয়া চরে এইচসিআই -এর অর্থায়নে চাইল্ড স্পনসরশিপ প্রোগ্রামের সহায়তা সামগ্রী বিতরণ রাউজান প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও একজন জেলা প্রশাসক থেকে শিক্ষকেরা শিখবে কি? সাবেক শিবির কর্মী-সাথী ও সদস্যদের নিয়ে জামায়াতের সমাবেশ রাজনীতিতে উদারতা না থাকায় গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্র নিজের ঘরে নিজে আগুন লাগিয়ে চাচাতো ভাই সহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা কাপাসিয়ায় গাছ কাটার অভিযোগ, প্রাণনাশের হুমকির দাবি

একজন জেলা প্রশাসক থেকে শিক্ষকেরা শিখবে কি?

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ শিক্ষার্থী, পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ। ২০২৫সালে পাশের হার ছিল ৬৮.৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার ৩.৯৯ শতাংশ কমেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এ বছর পাসের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ পরীক্ষার্থী। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৮.২০ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ পরীক্ষার্থী। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। এবার শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি। দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের রুটিন লেখাপড়ায় স্কুলছাত্রী সাদিয়া আফরিন নামক স্থানীয কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। একজন জেলা প্রশাসকের পাঠদান ও এসএসসির ফলাফল থেকে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষিকা শিখবে কি?
স্কুলছাত্রী সাদিয়া আফরিনের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন মা আরফা বেগম। আবেদনে সাড়া দিলেও তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা করলেন না জেলা প্রশাসক। তিনি ডেকে নিয়ে সাদিয়াকে এক সপ্তাহের বাড়ির কাজ (পড়া) দিলেন, ঠিক করে দিলেন পড়াশোনার রুটিনও। বললেন, পরের সপ্তাহে এসে সেই পড়া বুঝিয়ে দিতে হবে। নির্ধারিত পড়া শেষ করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হয় সাদিয়া। জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম পড়া বুঝে নিয়ে আবার পরের সপ্তাহের পড়া ঠিক করে দেন। এই রুটিনে সপ্তাহ থেকে মাস, মাস থেকে এক বছর পেরিয়ে যায়। এসএসসি পরীক্ষা দেয় সাদিয়া আফরিন। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, সে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাদিয়াদের বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায়। সে কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ৪৩ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
মেয়ের এমন সাফল্যে খুশি মা আরফা বেগম। নিজে পড়ালেখা করতে না পালেও কষ্ট করে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে চান তিনি। আরফা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে ডিসি স্যারের কাছে আবেদন করেছিলাম। স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন, ‘খোঁজখবর নিয়েছেন। আজকে মেয়েটা ভালো রেজাল্ট করেছে!’ ঘরে পড়ার টেবিলও নেই সাদিয়াদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আলাদা সড়ক নেই। অন্যের লিচুবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পথ পেরিয়ে টিনের ছাপরায় পৌঁছাতে হয়। দুই শতক জমির ওপর অবস্থিত ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে সাদিয়ার মা–বাবা ও ছোট বোনের ঘুমানোর জায়গা। অন্য পাশে সাদিয়া ও তার মেঝ বোনের থাকার জায়গা। একটি আলমিরার ওপরে সাজানো সাদিয়ার বইপত্র। ঘরের পাশেই ছোট্ট একটি রান্নাঘর।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়ার সাদিয়া আফরিন। কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে সে একমাত্র জিপিএ–৫ পেয়েছে (সুত্র প্রথম আলো) ঘরে একটি পড়ার টেবিল নেই। কখনো বিছানায়, কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে সাদিয়াকে। সাদিয়ার বাবা মো. সেলিম একজন চালকল শ্রমিক। মা আরফা বেগম ঘর-গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। সেলিম-আরফা দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়। সাদিয়া বলেন জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেতাম; কিন্তু পড়াগুলো নিয়মিত করতাম। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যার অনেক সাহস দিয়েছেন। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পর মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছিল সেলিম-আরফা দম্পতির। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত বছর জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছিলেন আরফা বেগম। এক সপ্তাহ পরে মেয়েসহ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন আরফা। এ সময় জেলা প্রশাসক তাঁদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। পড়াশোনা নিয়ে সাদিয়াকে নানা প্রশ্ন করেন। সেদিন বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে পারেনি সাদিয়া।
প্রথম দেখার দিনেই জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম আর্থিক সহায়তা করেননি; বরং তিনি সাত দিনের বাড়ির পড়া ঠিক করে দিয়ে প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে পড়া দিতে বলেন। ঠিক করে দেন প্রতিদিনের পড়াশোনার রুটিনও। জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে বলেন, রাতে দুই ঘণ্টা আর ভোরে দুই ঘণ্টা পড়তে হবে। রাত ১০টায় ঘুমাবে এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠবে। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলবে। ক্লাস হোক বা না হোক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাবে। রুটিন অনুসরণ করলে চার মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন। যদিও পরের মাসেই সাদিয়াকে দেওয়া হয় সাত হাজার টাকা। এরপর শুরু হয় সাদিয়ার বুধবারের যাত্রা। সপ্তাহের সাত দিনের পড়া নিয়ে সে হাজির হতো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। মানুষের নানা অভিযোগ নিয়ে গণশুনানির ফাঁকে পড়া দিত, ভুল হলে সংশোধন করত, নতুন পড়া নিয়ে বাড়ি ফিরত। যেন সাদিয়ার দ্বিতীয় পাঠশালা হয়ে ওঠে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।
১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে সাদিয়ার নামের পাশে জিপিএ-৫ দেখে আনন্দে ভরে ওঠে সেলিম-আরফা দম্পতির ঘর। এরপর গত বৃহস্পতিবার পরিবারটি ছুটে যায় জেলা প্রশাসকের কাছে। জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে অভিনন্দন জানান, মিষ্টিমুখও করান। সাদিয়ার সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী। তিনি বলেন, ‘একমাত্র সাদিয়া আফরিন স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। জেলা প্রশাসক স্যার প্রায় সময়ই আমাদের স্কুলে আসেন, ক্লাসও নেন। সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন, পড়াতেন। তাঁর ভালো ফলের জন্য আমরা আনন্দিত।’
সাদিয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক র‌ফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম‌ দিন কথা বলে বুঝেছিলাম, ওর ম‌ধ্যে বেশ আগ্রহ আছে। তারপর ওকে একটা চ্যা‌লেঞ্জ দিলাম। ও স‌ত্যি স‌ত্যি রু‌টিন মে‌নে হোমওয়ার্কগু‌লো (বাড়ির কাজ) ক‌রে‌ছে।’ এমন হাজারো সাদিয়া চারপাশে রয়েছে, যারা লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-কলম পায় না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘দিনাজপু‌রের বেশ কিছু স্কুল ঘুরেছি, শিক্ষার্থী‌দের সঙ্গে কথা ব‌লে‌ছি। গত দেড় বছরে জেলা প্রশাসন থে‌কে কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদানের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।’
মা-বাবার অভাবের সংসারের হাল ধরতে চায়। সাদিয়া বলে, ‘স্যারের কাছে পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেতাম; কিন্তু পড়াগুলো নিয়মিত করতাম। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যার অনেক সাহস দিয়েছেন। মেয়ের সাফল্যে খুশি বাবা মো. সেলিমও। তবে আনন্দের পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। তিনি বলেন, ‘ডিসি স্যার আমার মেয়ের নিয়মিত খোঁজ রেখেছেন, তাকে সহায়তা করেছেন। মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়ালেখা করতে চায়। জানি না কতদূর পর্যন্ত পড়াতে পারব
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। এবার শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি। দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের রুটিন লেখাপড়ায় স্কুলছাত্রী সাদিয়া আফরিন কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। একজন জেলা প্রশাসক থেকে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকেরা শিখবে কি? বাংলাদেশ সরকার সরকারী স্কুল ও মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেতন ভাতা, বোনাস ও পেনশন ইত্যাদি দিয়ে থাকে। বেসরকারী স্কুল ও মাদ্রাসায় এমপিও, বোনাস, এককালীনসহ অন্যান্য সৃযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। তারপরও এসএসসিতে পাশের হার ৬২.২৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রায় ৬৯০,০০০ ছাত্রীছাত্রী উত্তীর্ণ(ফেল) হতে পারে নাই। সরকারের উচিত এমপিও, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস ও প্রমোশন ইত্যাদি রিভিউ করা।

ড. খন্দকার নাজমুল হক
প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা