ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে বাংলাদেশে মোট নদ নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ছোট-বড় ১০০৮টি নদ নদীর তালিকা তৈরি করে। বাংলাদেশ কিংবা ভারতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নদী ভারতে গঙ্গা আর বাংলাদেশে পদ্মা। এখন ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে তিস্তা। এ দু’টো নদী উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির প্রধান উৎস। এ দু’টো নদীর উৎসমুখে ভারত ব্যারেজ আর ক্যানেলের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নিয়ে উত্তরাঞ্চলকে মরুভুমি করে ফেলেছে। ফারাক্কার ভয়াবহ ক্ষতি অনুভব করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। তিনি ১৯৭৬ সালে লাখো মানুষকে সাথে নিয়ে লংমার্চ করে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও আওয়াজ তুলেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়। এতে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর ৮০ ভাগ পানি পাওয়ার গ্যারেন্টি ক্লজ ও বিরোধ নিরসনে সালিশি ক্লজ সংযোজিত ছিল। ভারত শেখ হাসিনা সরকারের সাথে পদ্মা পানি নিয়ে গ্যারেন্টি ক্লজহীন ত্রিশ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করে। আজ অবধি চুক্তি মোতাবেক কখনই পানি পায়নি বাংলাদেশ। তিস্তার ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব দেখে রংপুরের মানুষ আওয়াজ তুলেছে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি) প্রায় চার বছর কাজ শেষে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি নদ-নদী সিলেট বিভাগে। এ বিভাগের চারটি জেলায় নদীর সংখ্যা ১৫৭। সবচেয়ে কম নদী চট্টগ্রাম বিভাগে। এ বিভাগে নদীর সংখ্যা ৬২। নদ-নদীর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগ। এ দুই বিভাগে নদ-নদীর সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৫ ও ১২৭। এরপর নদ-নদীর সংখ্যা বেশি ঢাকা বিভাগে, ১২৫টি। রংপুর বিভাগে ১১৯টি। বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে নদ-নদীর সংখ্যা যথাক্রমে ১০০ ও ৭২। তবে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে আপত্তি রয়েছে নদী গবেষকদের। তারা বলছেন, দেশে নদ-নদী রয়েছে দেড় হাজারের বেশি।
বর্তমানে জীবন্ত নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি। ২২ হাজার কি:মি দীর্ঘ নদীপথ রয়েছে। দীর্ঘতম নদী পদ্মা। দেশের তিন বিভাগের ১২টি জেলায় প্রবাহিত নদীটির দৈর্ঘ্য ৩৪১ কি:মি:। বর্তমানে ২০০ কি:মি বেশি নদী রয়েছে ১৪টি। এ ছাড়া ১০০ থেকে ১৯৯ কি:মি নদী রয়েছে ৪২টি, ১০ থেকে ৯৯ কি:মি নদী ৪৮০টি এবং ১ থেকে ৯ কি:মি দৈর্ঘ্যের নদীর সংখ্যা ৩৭৬। এক কি:মি কম দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪১টি। সবচেয়ে বেশি নদী রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়, ৯৭টি। বাংলাদেশের অসংখ্য নদী দূষণের শিকার হয়ে বিপন্ন-বিপর্যস্ত। বিশ্বের আর কোথাও এ দেশের মতো এমন নদীহত্যার নজির নেই। বহির্বিশ্বে প্রকৃতির উপহার সংরক্ষণের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশে এখনো নেওয়া হচ্ছে না পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ফলে ধীরে ধীরে প্রাণ হারাচ্ছে তুরাগ, বুড়িগঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী। দেশে নদী দখলদার উচ্ছেদের আইন আছে, কিন্তু তার আইনের কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইনত নদ-নদী দখল করা ও দূষণ ছড়ানো ফৌজদারি অপরাধ। দেশের সব নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত এক রিটের রায়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ দেন। রায়টির ২৭১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের যে কোনো অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি হওয়ায় এসব সম্পত্তির হানি ঘটলে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী হবেন।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নদীর পানিতে ১১ ধরনের ক্ষতিকর ধাতুর দেখা মিলেছে। ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বংশী, ধলাই বিল, মেঘনা, সুরমা, কর্ণফুলী, হালদা, খিরু, করতোয়া, তিস্তা, রূপসা, পশুর, সাঙ্গু, কাপ্তাই লেক, মাতামুহুরী, নাফ, বাকখালী, কাসালং, চিংড়ি, ভৈরব, ময়ূর ও রাজখালী খাল। আর এসব জলাধারের পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে জিংক, কপার, আয়রন, লেড, ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, কার্বন-মনোক্সাইড ও মার্কারির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত ৪০ বছরে ঢাকা, চট্টগ্রামের নদীগুলো চরম মাত্রার দূষণের শিকার হয়েছে।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের দফা ১ অনুযায়ী হাইকোর্টে মামলা দায়েরের অধিকারী বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। ২৮৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টির ২৭৯ পৃষ্ঠায় আদালত বলেন, ‘নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে এর কঠিন সাজাসহ বড় আকারের জরিমানা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত মামলা করা, তদন্ত ও বিচারের পদ্ধতি উল্লেখ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩ আইনটি নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্পকারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদীদূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নৌপরিবহনযোগ্য হিসাবে গড়ে তোলাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে একটি কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩-এর ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নদ-নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কার্যাবলির মধ্যে সমন্বয় সাধন, অবৈধ দখলমুক্ত এবং পুনর্দখল রোধ, নদী এবং নদীর তীরে স্থাপিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ,নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখা, বিলুপ্ত বা মৃতপ্রায় নদী খনন, নদীসংক্রান্ত তথ্য ভান্ডার উন্নয়নকরণ, নদী উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয়, নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, নদী রক্ষাকল্পে স্বল্পকালীন ও দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা, নদী রক্ষার্থে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নদী রক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিবীক্ষণ, নদী রক্ষা সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার ব্যবহারিক প্রয়োগ পর্যালোচনাক্রমে ও প্রয়োজনবোধে উক্ত আইন ও নীতিমালা সংশোধন, জলাশয় এবং সমুদ্র-উপকূল দখল ও দূষণমুক্ত রাখা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করতে হবে। আর এগুলো সম্পাদন করবে নদী রক্ষা কমিশন।
ভারতের আগ্রাসী পানি নীতি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে মরণবাঁধ হিসেবে খ্যাত ‘ফারাক্কা ব্যারেজ’ বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে পদ্মা ও তার শাখা-প্রশাখাগুলোর দফারফা করে ছেড়েছে। এক সময়ের অন্যতম নদী হিসেবে পরিচিত পদ্মা এখন বিশাল বালিচরের নিচে চাপা পড়ে হাহাকার করছে। দেখলে মনে হয়, নদী নয় যেন নদীর জীবাশ্ম ফসিল। এক সময়ের যৌবনা আর দুরন্ত হয়ে ছুটে চলা পদ্মা এখন মরা নদীর নাম। শাখা প্রশাখা নদ-নদী বড়াল, মরা বড়াল, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুড়াসাগর, চিকনাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতা কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজল, হিসনা, সাগরখালি, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলাবত এদের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। গজলডোবা বাঁধ দিয়ে নয় তিস্তা মহানন্দা ক্যানেলে ২৫ কিলোমিটার খাল কেটে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত।
ভারতের পানি আগ্রাসী নীতি শুধু এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলোকে শুকিয়ে মারেনি, যার প্রভাব পড়েছে এসব নদীর সাথে সংযুক্ত খাল-বিলেও। এসব শুকিয়ে গেছে। বিলহালতি, বিলহিলনা, মহানগর, বিলভাতিয়া, উথরাইল, খিবিরবিল, চাতরা, মান্দারবিল, বিলকুমলী, পাতিখোলা, অঙ্গরা, চাঙ্গা, দিকমী, পারুল, সতী, মালসী, ছোনী, বাঘনদী, পিয়ারুল, মিরাঁ, রক্তদহ, কুমারীদহ, খুকসী, জবায়ের, বাঁধ বাড়িয়া গ্রামের বিল আর দহ হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে। নদী-খাল-বিল মরে যাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। খাল-বিল-দীঘি ভরা মাছ নেই। হারিয়ে গেছে অর্ধশত বেশি প্রজাতির মাছ। ভারত তার পানি আগ্রাসী নীতিতে গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারেজ দিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের মহাবির্পযয় ডেকে এনে ক্ষান্ত হয়নি, ভারত সীমান্তের ওপারে তিস্তা নদীর ওপারে গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করে এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে পুরো উত্তরাঞ্চলে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদীও পদ্মার পরিণতি লাভ করেছে। ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে কুষ্টিয়া যেমন গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। তেমনি গজলডোবা ব্যারেজের কারণে তিস্তার ১২৫ কিলোমিটার জুড়ে এখন পানির বদলে বালির উত্তাপ। তিস্তাসহ এ আঞ্চলে ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আলিয়া দুধকুমার, বুড়ি, তিস্তাসহ ৩৫টি ছোট-বড় নদ-নদী অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। উত্তরের নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, জয়পুরহাট জেলার ৩৫ উপজেলায় সাড়ে তের লাখ একর জমিতে চাষাবাদের জন্য সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন তিস্তা ব্যারাজ পানির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পদ্মা তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলো পানি বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে ভারতের দাদাগিরির নিচে চাপা পড়ে আর্তনাদ করছে নদ-নদীগুলো। প্রয়োজনে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলা করে অভিন্ন নদীগুলোর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। আজ চারিদিকে আওয়াজ উঠেছে নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও
ড. খন্দকার নাজমুল হক
গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ।