তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের রাজনগরের করিমপুর চা-বাগানের ছোট্ট একটি ঘর থেকে শুরু হয়েছিল কুসুম মুন্ডার স্বপ্নযাত্রা। প্রতিদিনের অভাব, সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও থেমে যাননি তিনি। পরিবারের দৈনিক ১৮৭.৪৩ টাকার আয়ে চলা সেই সংসার পেরিয়ে আজ তিনি পড়ছেন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ)।
সম্প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’-এ নিজের জীবনসংগ্রাম, শিক্ষা ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন কুসুম। অনুষ্ঠানটি অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রচার করা হয়।
কুসুম জানান, ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা-মা দু'জনেই চা-বাগানের শ্রমিক। অল্প আয়ে সংসার চালানোই ছিল কঠিন, সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাগানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা শুরু। পরে দূরের স্কুলে হেঁটে যেতেন প্রতিদিন। টিফিনের জন্য বাবা-মা ১০ টাকা দিলেও সেই টাকা খরচ না করে জমিয়ে রাখতেন খাতা-কলম কেনার জন্য। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য না থাকলেও নিজের চেষ্টায় এগিয়ে গেছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল কুসুমের। সেই স্বপ্ন নিয়েই বিজ্ঞানে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন বা কোচিংয়ের সুযোগ পাননি। তবুও হারিকেনের আলোয় রাত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসে এসএসসি পরীক্ষার আগে। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও শারীরিক অসুস্থতায় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ দুই বছর শয্যাশায়ী থাকতে হয় তাঁকে। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসা করাতে হয়েছে বাবা-মাকে। তবুও পড়াশোনা থেকে সরে যাননি কুসুম।
তিনি বলেন,“অসুস্থ অবস্থায়ও আমি শুয়ে শুয়ে পড়তাম। আমার মা আমাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন, যেন আমি রাস্তায় পড়ে না যাই।
পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও আর্থিক সংকটের কারণে সেখানে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও ইংরেজি ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। শুরুতে ক্লাসের লেকচার বুঝতে কষ্ট হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। ক্লাস রেকর্ড করে বারবার শুনতেন এবং নিয়মিত ইংরেজি বলার চর্চা করতেন।
বর্তমানে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কুসুম। তিনি মনে করেন, তাঁর চা-বাগান এলাকার মানুষ এখনো শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। তাই শিক্ষক হয়ে নিজের কমিউনিটির মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
কুসুম বলেন, “আমি চাই আমাদের বাগানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক। আমার মতো যারা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, তারা যেন স্বপ্ন দেখতে সাহস পায়।”
দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করে কুসুম মুন্ডার এই পথচলা এখন অনেক তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প।